বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান।
বিডিআর বিদ্রোহের ঘটনা তদন্তে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ল ম ফজলুর রহমান বলেছেন, আর্মি ও দেশকে দুর্বল করতেই বিডিআর হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এই হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বিডিআরকে দুর্বল করা হয়েছে, তার নাম বদল করা হয়েছে। সেনাবাহিনী ও দেশকে দুর্বল করা হয়েছে। আমরা এমন সুপারিশ করতে চাই, যেন বাংলাদেশে কোনো দিন ২৫ ফেব্রুয়ারি মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। স্বচ্ছভাবে তদন্ত করে তিন মাসের মধ্যে পিলখানা হত্যাযজ্ঞের তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হবে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও আনা হবে জিজ্ঞাসাবাদের আওতায়।
এত বছর পর ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে গঠন করা হয়েছে ৭ সদস্যের স্বাধীন তদন্ত কমিশন। কমিশনের সঙ্গে শহীদ পরিবারের সদস্যদের মতবিনিময় সভায় উঠে আসে সেই সময়ের ভয়াবহ ও নির্মমতার কথা। সঠিক বিচার না হওয়ায় আক্ষেপ জানান স্বজন হারানো পরিবারের সদস্যরা। বিডিআর হত্যাকাণ্ডকে সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত দাবি করে শহীদ পরিবারের সন্তানরা জানান, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে উন্মোচিত হোক প্রকৃত ঘটনা। বিচার হোক দোষীদের। এমন ভয়াবহ ঘটনা যেন আর কখনও এ দেশে না হয়।
তদন্ত কমিশনের প্রধান আরও বলেন, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আমরা যাঁদের সন্দেহ করি, বিশেষ করে শেখ হাসিনা, তিনি ভারতে অবস্থান করছেন। আমরা ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করে হয় তাঁকে এক্সট্রাডাইট (প্রত্যর্পণ) করতে বলব কিংবা আমাদের দল সেখানে গিয়ে তাঁর সাক্ষাৎকার নেব। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বা সরাসরি—যেটা আমাদের জন্য আইনসিদ্ধ হয়, সেটা করব। দেশি–বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা মিলে পিলখানায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল। এটা কোনো বিদ্রোহ নয়, এটি কর্মকর্তাদের হত্যার ষড়যন্ত্র ছিল।
গতকাল রাজধানীর মহাখালীতে রাওয়া কমপ্লেক্সের অ্যাংকর হলে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় ফজলুর রহমান এ কথাগুলো বলেন। বিডিআর হত্যাকাণ্ডের শহীদ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে ‘জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন’ এই মতবিনিময় সভার আয়োজন করে। সভায় রিটায়ার্ড আর্মড ফোর্সেস অফিসার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের (রাওয়া) প্রতিনিধি, বিডিআর হত্যাকাণ্ডের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন, জীবিত ফিরে আসা কর্মকর্তা এবং তখন সেনাবাহিনীতে কর্মরত ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত কমিশনের প্রধান ফজলুর রহমান বলেন, ঘটনার ১৫ বছরের মাথায় এই কমিশন গঠন করা হলো। ইতিমধ্যে অনেক প্রমাণ নষ্ট হয়ে গেছে। জাতীয় দাবির পরিপ্রেক্ষিতে এই তদন্ত কমিশন গঠন করা হয়েছে। তবু আমরা কোনো জিনিস গোপন রেখে কিছু করতে চাই না। যা হবে, খোলাখুলি হবে। গণমাধ্যমের মাধ্যমে সব বিষয় আমরা জাতিকে জানাব।’
কর্মপরিধি নিয়ে কমিশনের প্রধান বলেন, আমাদের দেওয়া তিন মাস সময়ের মধ্যেই আমরা তদন্ত শেষ করার চেষ্টা করব। এরপরও সময় বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে সময় বাড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা। এই তদন্তের দুটি অংশ আছে। একটি আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ এবং আরেকটি বহির্দেশের। তদন্তে অভ্যন্তরীণ বিষয়টিকে আমরা দুই মাসের মধ্যে শেষ করতে চাই।
ফজলুর রহমান বলেন, পদুয়া–রৌমারী যুদ্ধে ভারতকে পরাজিত করায় যে সরকার আমাকে চাকরিচ্যুত করেছিল, সেটা কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার নয়। আওয়ামী লীগ সরকার আমাকে পদচ্যুত করে বিডিআরের মহাপরিচালক থেকে ১১ ডিভিশনের জিওসি করেছিল। সরকার পরিবর্তনের পর আমাকে চাকরিচ্যুত করা হয়। কাজেই তদন্তের বাইরে কেউ থাকবে না।
কমিশনপ্রধান আরও বলেন, বিজিবি সদর দপ্তরে আমরা কাজ শুরু করেছি। আমাদের কোনো নিরাপত্তা বা যানবাহন দেওয়া হয়নি। তবে আমি আশ্বস্ত করতে চাই, এগুলো দেওয়া না হলেও এই তদন্ত আমরা শেষ করে ছাড়ব। তদন্ত কমিশন বক্তব্যগুলো মূল্যায়ন করবে। সেখানে উঠিয়ে আনার চেষ্টা করব, কোথায় কাকে অথবা কোন দেশকে সাহায্য করা হয়েছে। আশা করি অল্প সময়ে আমরা জাতির সামনে এই তদন্ত প্রতিবেদন তুলে ধরতে পারব।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের দিনটিকে যেন সেনাহত্যা দিবস উপলক্ষে পালন করা হয়, সেই সুপরাশি করা হবে জানিয়ে কমিশনপ্রধান বলেন, ‘হায়দার হোসেনের গান “কতটুকু অশ্রু গড়ালে হৃদয় জলে সিক্ত?” গানটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সংগীত হিসেবে ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি যেন বিডিআরের সব জায়গায় গাওয়া হয়, সেই সুপারিশও করা হবে। কোনো বিষয়কেই আমরা দৃষ্টির বাইরে রাখব না।
