বাংলাদেশ একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সংসদে বসেন এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। জাতীয় সংসদ আমাদের আইন প্রণয়ন, বাজেট পাস, জাতীয় নীতিমালা নির্ধারণ এবং প্রশাসনিক তদারকির কেন্দ্রবিন্দু। এ ধরনের গুরুদায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তির শিক্ষাগত যোগ্যতা কতটুকু হওয়া উচিত এ নিয়ে প্রশ্ন এখন আর শুধু কৌতূহল নয় বরং সময়োপযোগী আলোচনার বিষয়।
বর্তমানে বাংলাদেশের সংসদ সদস্যদের মধ্যে অনেকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত। কেউ কেউ দেশে কিংবা বিদেশে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। আইন, ব্যবসা, চিকিৎসা, প্রকৌশল এবং সমাজবিজ্ঞানসহ বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে দক্ষতা রয়েছে এমন সংসদ সদস্যও রয়েছেন।
তবে সব সদস্যের ক্ষেত্রেই এমন নয়। এখনো এমন অনেক সংসদ সদস্য রয়েছেন যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ। অনেক সময় দেখা যায় যারা জনগণের সেবা করার উদ্দেশ্যে রাজনীতিতে এসেছেন তাদের পক্ষে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার জটিল বিষয় বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই প্রসঙ্গে বলা প্রয়োজন সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশে সংসদ সদস্য হবার জন্য কোনো নির্দিষ্ট শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। ফলে জনগণের রায়কেই চূড়ান্ত ধরা হয়। কিন্তু প্রশ্ন হলো—একজন আইনপ্রণেতা যিনি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণের অঙ্গনে থাকবেন তার কি অন্তত একটি ন্যূনতম শিক্ষাগত মান থাকা উচিত নয়?
আধুনিক বিশ্বে নেতৃত্বের জন্য শুধু রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন জ্ঞান, বিশ্লেষণী ক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাস্তবতা অনুধাবন ও নীতিগত বোধ। একটি দেশের সংসদ তার উন্নয়নের দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে। শিক্ষাহীন নেতৃত্ব সেই উদ্দেশ্য পূরণে বারবার হোঁচট খায়।
তথ্য প্রযুক্তি, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক রাজনীতি, মানবাধিকার, টেকসই উন্নয়ন—এসব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গেলে যে ধরনের জ্ঞান ও প্রজ্ঞা প্রয়োজন তা অর্জন না থাকলে দেশ এগিয়ে যেতে পারে না। শিক্ষিত নেতৃত্ব শুধু সিদ্ধান্ত গ্রহণে দক্ষ নয় বরং জনগণের মধ্যে দায়িত্ববোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সংস্কৃতিও গড়ে তোলে।
অনেক দেশেই সংসদ সদস্যদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতার ন্যূনতম মান নির্ধারণ করা হয়েছে। ভারতে অন্তত মাধ্যমিক পাশ হওয়াকে একাধিক রাজ্যে নির্বাচনের যোগ্যতা হিসেবে ভাবা হয়েছে। পাকিস্তানেও কিছু সময়ের জন্য স্নাতক ডিগ্রিকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল যদিও পরে তা বাতিল হয়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এখন সময় এসেছে এ বিষয়ে জাতীয় পর্যায়ে গঠনমূলক সংলাপের।
তবে এখানে একটি সতর্কতা প্রয়োজন—শিক্ষা মানেই কেবল ডিগ্রি নয়। বাস্তব অভিজ্ঞতা মানুষের জন্য কাজ করার ক্ষমতা এবং দূরদর্শিতা—এগুলোও নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ গুণ। কিন্তু তারপরও একজন সংসদ সদস্যের হাতে রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ গঠনের দায়িত্ব থাকে—এজন্য মৌলিক শিক্ষার ভিত্তি থাকা আবশ্যক।
