শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রথমবারের মতো ডিসেন্ট্রালাইজেশন ও প্রাইভেটাইজেশনের সাহসী উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। রাষ্ট্রীয় ব্যাংকগুলোকে ভেঙে বেসরকারি ব্যাংকিংয়ের দ্বার উন্মুক্ত করা, আইএফআইসি ব্যাংক ও এবি ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের জন্ম—সবকিছুই ছিল একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক দর্শনের অংশ। লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ ভেঙে বাজারভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলা।
কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে,পরবর্তী সরকারগুলো সেই ধারাকে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে অর্থনীতিকে চালিয়েছে ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট ও শর্ট-টার্ম রাজনৈতিক স্বার্থের ভিত্তিতে। এর ফলে বিনিয়োগবান্ধব একটি টেকসই ইকোসিস্টেম তৈরি হয়নি; বরং আমরা হারিয়েছি দীর্ঘমেয়াদি লাভের সুযোগ।
ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট বনাম দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার : আজ বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি কার্যত এক ধরনের “ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট মোড”-এ চলছে। কোনো নির্দিষ্ট বিনিয়োগকারী এলে তার জন্য আলাদা আইন, আলাদা সুবিধা তৈরি করা হচ্ছে। আদানি,আম্বানি বা রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ—সব ক্ষেত্রেই আমরা দেখেছি অ্যাড-হক আইন ও নীতির প্রয়োগ। এতে তাৎক্ষণিক বিনিয়োগ এলেও দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
পুঁজিবাজার: আস্থার ধস এবং নীতিগত ব্যর্থতা: বাংলাদেশের পুঁজিবাজার আজ গভীর আস্থাহীনতায় ভুগছে। গত ১৭ বছরে যেসব নীতিনির্ধারণ করা হয়েছে, তার বেশিরভাগই বাজারের স্বাভাবিক গতি নষ্ট করেছে।বিশ্বের কোথাও বেস প্রাইস দিয়ে শেয়ার আটকে রাখা হয় না। অথচ বাংলাদেশে বেস প্রাইস চালু করে শেয়ার না বাড়তে দেওয়া হলো, না কমতে দেওয়া হলো—ফলে তৈরি হলো কারসাজির আদর্শ পরিবেশ। ফ্যাক্টরি বন্ধ, ডিভিডেন্ড নেই—তবুও শেয়ারের দাম বাড়ে। অথচ লাভজনক প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্ত হতে ভয় পায়।রেগুলেটর হওয়ার কথা ছিল নিরপেক্ষ। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখেছি, রেগুলেটর ও ব্যবসার মধ্যে অস্বাস্থ্যকর সংযোগ। একসময় ড. সফুর রহমান এসইসি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এই দর্শন নিয়ে যে—নীতি নির্ধারণ হবে ব্যুরোক্রেসি মাধ্যমে,আর বাজার চলবে নিজস্ব গতিতে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আইসিবির এমডি, শিক্ষকসহ নানা অপ্রাসঙ্গিক ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান বানানো হয়েছে, যার ফলে পলিসি মেকিং দুর্বল হয়েছে।
৫% ফ্লোট: ম্যানিপুলেশনের লাইসেন্স: ওয়ালটনের মতো বড় কোম্পানিকে মাত্র ৫% শেয়ার নিয়ে বাজারে আনা হয়েছে, যা কার্যত ম্যানিপুলেশনের দরজা খুলে দিয়েছে। একটি কোম্পানিকে অন্তত ২০–২৫% ফ্রি ফ্লোটে আনলে বাজারে স্বাভাবিক ভারসাম্য তৈরি হয়। কম ফ্লোট মানেই সহজ কারসাজি।
মার্জিন লোন ও বিনিয়োগকারীদের হাত-পা বাঁধা: মার্জিন লোনে “শুধু বিক্রি করা যাবে, কেনা যাবে না”—এই নীতির ফলে প্রায় ২৬ হাজার কোটি টাকার ট্রেডিং ক্ষমতা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। এটি কোনো ছোট সিদ্ধান্ত নয়। এর প্রভাব সরাসরি বাজারের লিকুইডিটিতে পড়েছে।
ব্যাংকিং সেক্টর: ডেলিবারেট রবারি ও আস্থার সংকট: পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামিক ব্যাংক করা—এটি একদিকে ক্ষুদ্র আমানতকারীদের রক্ষা করার প্রয়াস, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের ডেলিবারেট লুটপাটের ফল। ইসলামী ব্যাংকের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের এক লক্ষ কোটি টাকার বেশি ডিপোজিট রাতারাতি উধাও হওয়া কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়—এটি স্পষ্টতই ডেলিবারেট রবারি।বাংলাদেশ ব্যাংক ক্ষুদ্র আমানতকারীদের কথা ভেবে ব্যাংকগুলোতে হাজার হাজার কোটি টাকা ঢালছে—এটি ইতিবাচক। তবে দুর্বল ব্যাংকের নাম প্রকাশ্যে বলার ফলে যে মনস্তাত্ত্বিক ব্যাংক রান তৈরি হচ্ছে,সেটি নিয়ন্ত্রণে আরও সংবেদনশীল যোগাযোগ দরকার ছিল।
বিদেশি বিনিয়োগ ও রিটেনশনের ব্যর্থতা: জাপানের মতো দেশের বিনিয়োগকারীরা ধীরে ধীরে নিরুৎসাহিত হচ্ছে। জাইকার মতো প্রতিষ্ঠানের চলে যাওয়ার বার্তা দেশের জন্য ভয়াবহ সংকেত। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য স্টক মার্কেটে একাউন্ট খোলা, শেয়ার কেনা-বেচা—সবকিছুই এখনো অত্যন্ত জটিল ও সময়সাপেক্ষ।যেখানে একজন বাংলাদেশি বিনিয়োগকারী বসে বসে ইউএস মার্কেটে ট্রেড করতে পারেন, সেখানে একজন বিদেশি বিনিয়োগকারীকে বাংলাদেশে শেয়ার কিনতে ১৫ দিন অপেক্ষা করতে হয়—এটা বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নয়।
বন্ড মার্কেট: অবরুদ্ধ: কর্পোরেট বন্ড মার্কেট কার্যত বাংলাদেশ ব্যাংক ও ব্যাংকিং সেক্টরের হাতে বন্দি। একটি প্রাইভেট কোম্পানি সহজে বন্ড ইস্যু করতে পারে না। ফলে পুঁজিবাজারের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ আজও অনুন্নত।
সমাধানের পথ: বিদেশি ও প্রাতিষ্ঠানিক মার্কেট মেকার আনার জন্য আইন সংস্কার,বড় ও লাভজনক কোম্পানিকে প্রণোদনা দিয়ে তালিকাভুক্ত করা,কর্পোরেট বন্ড মার্কেট উন্মুক্ত করা,রেগুলেটরের নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা,ডিজিটাল ও সহজ বিনিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা। পুঁজিবাজার কোনো পচা মাছের বাজার নয়—যেখানে মানুষ প্রতিদিন ঠকতে ঠকতে অভ্যস্ত হয়ে যাবে। ভালো পণ্য, ভালো নীতি ও বিশ্বাসযোগ্য নিয়ন্ত্রণ ছাড়া কোনো বাজার টেকসই হয় না।বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ যে আস্থাহীনতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে হলে প্রয়োজন দূরদর্শী নীতিনির্ধারণ, স্বচ্ছতা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার—শর্ট-টার্ম ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট নয়।
Collected: FACE THE PEOPLE
