আজ চাইলে আমরা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিই। চাইলে সেবার দাম বাড়িয়ে দিই। সুযোগ পেলেই নিয়ম ভাঙি, আইনকে পাশ কাটাই। হাত বাড়ালেই মাদক পাওয়া যায়। খাদ্যে ভেজাল এখন অনেকের কাছে ব্যবসার অংশ। মানহীন শিক্ষা ব্যবস্থা, দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা, পরিকল্পনাহীন নগরায়ন—সব মিলিয়ে যেন বিশৃঙ্খল এক বাস্তবতা।
একজন মানুষ জ্বর নিয়ে হাসপাতালে গেলে, রোগ নির্ণয়ের আগেই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় একগাদা টেস্ট। তারপর ৮–১০ ধরনের ওষুধ। যেন চিকিৎসা নয়, অনুমানের ওপর চলছে মানুষের জীবন। শহরের অলিগলিতে গড়ে উঠছে অনুমোদনহীন ক্লিনিক। প্রেসক্রিপশন ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে ওষুধ। মানুষের স্বাস্থ্য যেন একেকটা ব্যবসায়িক পণ্য।
শুধু স্বাস্থ্যখাত নয়—সমস্যা ছড়িয়ে আছে সর্বত্র।
আমাদের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। একটু বৃষ্টি হলেই শহর পানিতে ডুবে যায়। রাস্তাঘাট ভাঙাচোরা। গণপরিবহন দুর্বল। ট্রাফিক আইন মানার সংস্কৃতি ভয়াবহভাবে দুর্বল। শহর পরিকল্পনা যেন কারও মাথাতেই নেই। নদী দখল, নদী দূষণ, পরিবেশ ধ্বংস—সবকিছু চলছে উৎসবের মতো।
সবচেয়ে ভয়ঙ্কর বিষয় হলো—দুর্নীতি এখন আর লজ্জার বিষয় নয়; বরং অনেকের কাছে এটি “স্বাভাবিক”। মানুষ নিজের লাভ ছাড়া আর কিছু ভাবতে চায় না। সামাজিক নিরাপত্তা দুর্বল, ন্যায়বিচারের প্রতি মানুষের আস্থা কমে যাচ্ছে। আমরা ধীরে ধীরে এমন এক সমাজে পরিণত হচ্ছি যেখানে সবাই সমস্যার কথা জানে, কিন্তু খুব কম মানুষ নিজেকে পরিবর্তন করতে প্রস্তুত।
তাহলে প্রশ্ন হলো—এখন কী করবো?
এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাবো?
নাকি পুরো সিস্টেম একা হাতে বদলে ফেলবো?
বাস্তবতা হলো—একজন মানুষ একা পুরো রাষ্ট্র বদলে ফেলতে পারে না। সব সমস্যার সমাধান এক জীবনে করা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে কি আমাদের কোনো দায়িত্ব নেই?
আছে। এবং সেই দায়িত্ব শুরু হয় নিজের ভেতর থেকে।
আমি যদি নিজে নিয়ম না মানি, তাহলে আইন মানার সংস্কৃতি কখনো গড়ে উঠবে না। আমি যদি নিজের লাভের জন্য অন্যায় করি, তাহলে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে। আমি যদি ভেজাল দিই, ঘুষ দিই, ট্রাফিক আইন ভাঙি, মিথ্যা বলি—তাহলে আমি নিজেও সেই সমস্যার অংশ, যার বিরুদ্ধে প্রতিদিন অভিযোগ করি।
আমরা সবাই “সোনার বাংলা” চাই। কিন্তু সোনার বাংলা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়, শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়—এটি প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।
একটি দেশ তখনই বদলায়, যখন তার মানুষ বদলায়।
আজ যদি আমি সততা বেছে নিই,
আজ যদি আমি নিয়ম মেনে চলি,
আজ যদি আমি অন্যায়ের বিরুদ্ধে অন্তত নিজের অবস্থান পরিষ্কার করি,
তাহলেই পরিবর্তনের শুরু হবে।
হয়তো আমি পুরো দেশ বদলাতে পারবো না।
কিন্তু আমি নিজেকে বদলাতে পারি।
আর একজন সচেতন মানুষই পারে আরেকজনকে বদলাতে।
সমস্যা থেকে পালিয়ে গেলে সমস্যা থেকে যায়।
কিন্তু মানুষ বদলাতে শুরু করলে সমাজও বদলাতে বাধ্য হয়।
সোনার বাংলা কোনো কল্পনা নয়।
কিন্তু সেটি গড়তে হলে প্রথম বিপ্লবটা শুরু করতে হবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে—নিজেকে বদলানোর মাধ্যমে।
